তারিখঃ ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোবাইলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশীয় সংস্কৃতি ও যুব সমাজ: মোয়াজ্জেম বিন আউয়াল কবি ও সাংবাদিক

মোবাইল ফোন যেন আজ মানুষের নিত্য সঙ্গী। মানুষ একটু সময় পেলেই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন। কেউ কেউ আবার মোবাইল ফোন পেলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। মোবাইল মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মোবাইল ফোন কাছে থাকলে অতি সহজে একজন আরেক জনের সাথে মনের ভাব আদান-প্রদান করতে পারে। এক সময় বহু কষ্টে মানুষ যোগাযোগ রক্ষা করতো। মোবাইল ফোন আবিষ্কারের ফলে সব কিছু এখন মানুষের হাতের কাছে। সত্যিই মোবাইল ফোন এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।

এই মোবাইল ফোন তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। আর যিনি এই মোবাইল ফোন তৈরি করেছিলেন তার নাম ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপার। সেজন্যই তাকে বলা হয় মোবাইল ফোনের জনক। মার্টিন কুপার সে সময়ে কাজ করতেন তখনকার এক ছোট টেলিকম কোম্পানি মোটরোলায়। কিন্তু সব সময় তার স্বপ্ন ছিলঃ  এমন একদিন আসবে যখন সবার হাতেই তার নিজস্ব ফোন থাকবে, আর সেই ফোনে যে কোন সময় মানুষ একে অন্যের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারবে। বিবিসির লুইস হিদালগোকে মার্টিন কুপার বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের কাছে এ গল্প বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো শোনাবে। সত্যি আজ তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমানিত হয়েছে। গোটা পৃথিবী আজ মোবাইল ফোনে প্রভাবিত।

যুবক থেকে যুবতী, বৃদ্ধ সহ সকলেই মোবাইল ফোন ছাড়া কিছুই কল্পনা করতে পারে না। প্রেম, ভালোবাসা, পরকীয়া, বন্ধুত্ব সব এখন মোবাইল ফোনে হচ্ছে। সেই মোবাইল ফোন যখন এন্ড্রয়েড ভার্সনে রূপান্তরিত হলো, তখন গোটা পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয়। মোবাইল ফোনের নানান রকম চটকদার বিজ্ঞাপনে মানুষ দিশেহারা। ছোট বেলা বাংলা দ্বিতীয় পত্রে ভাব-সম্প্রসারন অধ্যায়ে পড়তাম “বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ”। এই শব্দ গুলোর অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি বিজ্ঞান যেমন উপকারী ঠিক তেমনি অপকার ও রয়েছে।

আধুনিকতার যুগে এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এনে দিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। সমস্ত পৃথিবী যেন মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয়। সময় কমিয়ে কাজের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে মোবাইল ফোন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিষয় সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। স্মার্ট ফোনের বদৌলতে নারী পুরুষ নির্বিঘ্নে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক তৈরি করছে। কেউ কেউ কথা বলতে বলতে অনায়াসে পরকীয়ায় জড়িয়ে পরছে। কেউ আবার ফেসবুকে সম্পর্ক তৈরি করে হাতিয়ে নিচ্ছে সবকিছু।

তরুণ সমাজের বিশাল একটা অংশ। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় কাজেই এই মোবাইল ফোন কে ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ যুবক অনাকাংখিত বিষয়ে ঝুঁকে পড়ছে বেশি। সময় অসময় তরুণ সমাজ আজ মোবাইলে ব্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলে মেয়েরা আজেবাজে এ্যাপসে ঢুকে পরে। ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার, ভিডিও গেইমস, স্কাইপ, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইভার, ইমো এবং চ্যাটিংয়ের বিভিন্ন এ্যাপসের পাশাপাশি এতে রয়েছে বিষয় ভিত্তিক হাজারো স্মার্ট এ্যাপ্লিকেশন। সবায় এখন প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। মাদকের মতো মোবাইল ফোনে আসক্ত গোটা যুব সমাজ। 

মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ছাত্র /ছাত্রীরা পড়াশোনার প্রতি বিমুখ ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পরছে। সমাজে অপরাধ প্রবনতা বেড়ে যাচ্ছে। যে কারণে সমাজে দিন দিন যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও পরকীয়া, ব্ল্যাকমেইল, খুন বেড়েই চলছে। আজকের যুগে মোবাইল ফোন বিজ্ঞানের এক অনন্য সৃষ্টি। বর্তমানে মোবাইল ফোন ছাড়া চলা অসম্ভব প্রায়। এই ব্যাপারে আমরা সকলেই একমত। কিন্তু এর অপব্যবহারের জন্য মানুষ নিজেই দায়ী। অবাধে মোবাইল ব্যবহারে কিশোর কিশোরীদের বিপদগামী করে তুলছে। যার জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। সরকার শুধু আইন করলেই চলবে না, সেই সাথে অভিবাবক মহলের সচেতনতা খুব জরুরি।

 বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে এই এন্ড্রয়েড মোবাইলে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নীল ভিডিও ও বাজে শর্ট ফিল্ম মুহুর্তে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। যা দেখে তরুণ তরুণী বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। বাংলার ভাটিয়ালি, পল্লী, জারি, বাউল গান আস্তে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। কালের বিবর্তনে হা-ডুডু, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, বুদ্ধিমান, লম্প ঝাপ, দৌড় প্রতিযোগিতা, কাছি টান, ভলিবল, ফুটবল, মেয়েদের পাতিল ভাঙা,  বিস্কুট খেলা, দড়ি ঘুরান, খেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে কিশোর কিশোরীরা এখন মোবাইলে ব্যস্ত। এতে করে বর্তমান ছেলে মেয়েরা শারিরীক ভাবে আগের চেয়ে অনেক দূর্বল হয়ে পরছে। যে সময়ে যুবকদের চরিত্র গঠন হওয়া দরকার, সে সময়ে তারা বিপদগামী হয়ে পরছে। অনেক ছেলে মেয়েরা এখন পর্নোগ্রাফিতে ব্যস্ত হয়ে তাদের কচি মন বিগড়ে যাচ্ছে। তাদের নেতিবাচক ও আলস্য ভাবের প্রভাব পরছে সমাজ ও পরিবারে। জীবন শুরু হওয়ার আগেই দিশা হারিয়ে ফেলছে যুব সমাজ। বাবা মায়ের ভাষায় অপরিণত বয়সে বিগড়ে বা নষ্ট হ’য়ে যাচ্ছে ছেলে মেয়ে। ফলে অনিশ্চিত পথের দিকে ধাবিত হচ্ছে আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

অনেকে আবার ভালোবাসার অভিনয় করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। সম্প্রতি ফেইসবুকের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে টিনএজ বয়সের মেয়েরা। নগ্ন ছবি বা নগ্ন ভিডিও ধারণ করে অনেক উঠতি বয়সের মেয়েদের কে সর্বনাশ করছে কিছু মানুষরূপী অমানুষ। সেজন্য পত্র পত্রিকা টেলিভিশনে চোখ পরলেই দেখা যায় যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো অহরহ ঘটনা। সেই সাথে অনেকে জড়িয়ে পরছে মাদকাসক্তে। এর ফলে খুন ও ছিনতাই বাড়ছে। অজান্তে ঐশীর মতো হাজারো ঐশী তৈরি হচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে। পর্নগ্রাফির তৈরি, সংরক্ষণ, বাজারজাত  ও পরিবহন নিষিদ্ধ করে, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ অনুমোদন হলেও তার কার্যকর না থাকায় বেড়ে যাচ্ছে পর্নোগ্রাফি। মেধা বিকাশে যুবকদের  বই যেখানে নিত্য সঙ্গী হওয়া দরকার, সেখানে যুবকরা উদাসীন হয়ে পরছে। রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময়, বাসে চলার সময় কানে হেডফোন দিয়ে অনেকে চলা-ফেরা করছে, যা সঠিক নয়।

১৮ বছরের কম বয়সী ছেলে কিংবা মেয়েদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধি নিষেধ রয়েছে, কিন্তু কেউ এই বিধি নিষেধের তোয়াক্কা করে না। তাছাড়া মোবাইলের সহজলভ্যতার কারণে সবার হাতেই মোবাইল পৌঁছে গেছে। এতে করে বিভিন্ন হয়রানির স্বীকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এই জন্য প্রচলিত আইনে যতটুকু শক্ত অবস্থান নিয়ে তা কার্যকরের ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের হাতে মোবাইল দেওয়া যাবে না।

এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও ফেইসবুকের অপব্যবহারে তরুন প্রজন্মের অবক্ষয়রোধে কবি ও সাংবাদিক মোয়াজ্জেম বিন আউয়াল বলেন,আধুনিক যুগে প্রতিযোগিতার বিশ্বে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। তবে সে প্রযুক্তি যেন লক্ষ্যবিহিন না হয়। কারণ আজকের তরুণই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তরুণরা যেন বিপদগামী না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

তাই আসুন আমরা সকলেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করি। নতুন প্রজন্ম কে নিশ্চিত বিপদ থেকে রক্ষা করি। আমাদের মানসিকতা বদলিয়ে গোটা সমাজ কে বদলে ফেলি।

পোষ্টটি শেয়ার করুনঃ

About Author

আড়াইহাজারের সময়

আড়াইহাজারের সময় হলো সবচেয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া ওয়েব পোর্টাল। আড়াইহাজারের মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পত্রিকা। আড়াইজারের সময়ের সাথেই থাকুন। আমরা সর্বদা সত্য প্রকাশে অবিচল।

Comments are closed.